পূর্বপুরুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও পিতৃঋণ
গয়ায় পিণ্ডদান করতে আসা মানুষের অনুভূতি একেক রকম—কারও মনে শোক, কারও কৃতজ্ঞতা, কারও দীর্ঘদিনের একটি ইচ্ছা পূরণের তাগিদ। হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরায় মানুষের জন্মের সঙ্গে তিনটি ঋণের কথা বলা হয়। তার একটি পিতৃঋণ—যে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে জীবন, পরিবার ও পরিচয় পেয়েছি, তাঁদের প্রতি ঋণ। গয়ায় শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান সেই ঋণ স্মরণ করে শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি পথ।
এখানে গয়ার তীর্থশ্রাদ্ধের কথা বলা হচ্ছে। অন্ত্যেষ্টির পরে বাড়িতে যে আচার পালন করা হয়, তার মধ্যেও পিণ্ড অর্পণ থাকতে পারে; তবে সেটি ও গয়ায় এসে করা শ্রাদ্ধের বিধি এক নয়। প্রিয়জনের মৃত্যুর কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশক পরেও অনেকে গয়ায় আসেন। আপনারা কখন আসবেন, তা পারিবারিক রীতি অনুযায়ী পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
পিণ্ড কী, কী দিয়েই বা তৈরি হয়
পিণ্ড হল হাতে গড়া ছোট গোলাকার অর্ঘ্য। সাধারণত রান্না করা ভাত দিয়ে তৈরি হয়; বহু পরম্পরায় যবের আটা ব্যবহার করা হয়। কালো তিল পিণ্ডে মেশানো হয় বা সঙ্গে দেওয়া হয়। জল, তিল, মধু, দুধ, ঘি, ফুল ও কুশ থাকে নিবেদনের উপকরণ হিসেবে। এর জন্য আলাদা কোনও মূর্তি বা দামি বস্তু লাগে না। যে অন্ন প্রতিদিন একটি পরিবারের জীবনধারণের ভিত্তি, সেই অন্নই পূর্বপুরুষকে নিবেদন করা হয়।
গোলাকার পিণ্ডের নিজস্ব তাৎপর্য রয়েছে। যে দেহ আর নেই, পিণ্ড তার প্রতীক। ধর্মীয় বিশ্বাসে, প্রয়াতজনের সূক্ষ্মদেহের পরবর্তী গতির জন্য অবলম্বন ও শক্তি প্রয়োজন; পিণ্ড অর্পণের মাধ্যমে কর্তা সেই অবলম্বন নিবেদন করেন। তাই কর্তা নিজের হাতে পিণ্ড গড়েন—কেবল থালায় কোনও অর্ঘ্য সাজিয়ে দেওয়াই এই কর্ম নয়।
যব ও তিলও ইচ্ছেমতো বেছে নেওয়া হয়নি। তিলকে শুদ্ধি ও অক্ষয়ত্বের প্রতীক এবং যবকে পিতৃকর্মের বিশেষ পবিত্র অন্ন বলে মানা হয়। তাই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবারের বিধিতেই কোনও না কোনওভাবে এই উপকরণগুলির ব্যবহার দেখা যায়।
পিণ্ডদান, শ্রাদ্ধ ও তর্পণের পার্থক্য
তিনটি শব্দ এত ঘন ঘন একসঙ্গে শোনা যায় যে প্রথমবার মনে হতে পারে, সবই একই কর্মের নাম। আসলে শ্রাদ্ধ হল সম্পূর্ণ আচার; তার মধ্যে তর্পণ ও পিণ্ডদান দুটি পৃথক নিবেদন।
তর্পণ হল জল নিবেদন। অঞ্জলিতে জল, কালো তিল ও কুশ নিয়ে কর্তা পূর্বপুরুষের নাম করে, এক প্রজন্মের পর অন্য প্রজন্মের উদ্দেশে তা অর্পণ করেন। এর মাধ্যমে পূর্বপুরুষের তৃপ্তি কামনা করা হয়। পিণ্ডদান অন্নের নিবেদন, যা আহার ও দেহ—দুইয়েরই প্রতীক। আর সংকল্প, তর্পণ, পিণ্ড অর্পণ, ব্রাহ্মণভোজন ও শেষের দান মিলিয়ে সম্পূর্ণ বিধি হল শ্রাদ্ধ।
তাই কথায় কথায় আমরা গয়ায় পিণ্ডদান করতে যাওয়ার কথা বললেও, সেখানে সাধারণত শ্রাদ্ধের সম্পূর্ণ আচারই করা হয়। পিণ্ডদান তার প্রধান অঙ্গ বলে এই নামটিও প্রচলিত।
যিনি কর্ম করেন—কর্তা বা যজমান
যিনি সংকল্প নিয়ে নিজের হাতে নিবেদন করেন, তাঁকে কর্তা বা যজমান বলা হয়। প্রচলিত রীতিতে সাধারণত পুত্র এই দায়িত্ব নেন; একাধিক পুত্র থাকলে অনেক পরিবারে জ্যেষ্ঠ পুত্র কর্তা হন। পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য আত্মীয়ের কর্তা হওয়ার বিধানও আছে।
পুত্র না থাকলে পৌত্র, প্রপৌত্র, ভাই, ভাইপো, দৌহিত্র বা অন্য নিকটাত্মীয়ের কর্তা হওয়ার বিধান বিভিন্ন পরম্পরায় রয়েছে। কন্যার পিণ্ডদানেরও প্রচলন আছে। গয়ায় এই প্রসঙ্গে ফল্গুতীরে সীতাদেবীর পিণ্ড অর্পণের কাহিনি বলা হয়। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী কর্তা নির্বাচন ও সংকল্পের ভাষা বদলায়; যাত্রার আগে পাণ্ডাজির সঙ্গে কথা বলে নিন।
কর্তা একজন হলেও পরিবারের অন্যরাও আচারে অংশ নিতে পারেন। স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন—সকলেই পাশে বসতে পারেন। নিবেদন কর্তার হাতে হয়, আর সংকল্পে পরিবারের সকলের সম্পর্ক যুক্ত থাকে।
গয়ার তীর্থপুরোহিত—গয়াওয়াল পাণ্ডাজি
গয়ায় যাঁরা পরম্পরায় পিতৃকর্ম করান, তাঁরা গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিত বা পাণ্ডাজি। এই পরিবারগুলির পুরোহিতেরা বংশপরম্পরায় যজমানদের শ্রাদ্ধকর্ম করিয়ে আসছেন। অনেক বাড়িতে আজও পুরনো বংশপঞ্জির খাতা রয়েছে, যেখানে যজমান পরিবারের নাম, গ্রাম ও গোত্র লেখা আছে—কখনও একশো বছরেরও পুরনো তথ্য।
পাণ্ডাজির কাজ শুধু মন্ত্রপাঠ নয়। পরিবারের পরিস্থিতি অনুযায়ী কোন বেদি, কোন ক্রম ও কী ধরনের সংকল্প প্রযোজ্য, তিনি তা ঠিক করেন। তারপর প্রতিটি ধাপে কী বলতে হবে, হাত কীভাবে রাখতে হবে, কোন দিকে মুখ করতে হবে এবং কখন অর্ঘ্য ছাড়তে হবে—সব বুঝিয়ে দেন। প্রথমবার যাঁরা আসেন, প্রতিটি ধাপের এই ব্যাখ্যা তাঁদের ভরসা দেয়।
সংকল্প—আপনার নাম, গোত্র ও পূর্বপুরুষ
প্রতিটি বিধি সংকল্প দিয়ে শুরু হয়। কর্তা হাতে জল, অক্ষত, ফুল ও সামান্য দ্রব্য নিয়ে উচ্চারণ করেন—কে, কার উদ্দেশে এবং কোথায় এই কর্ম করছেন। সংকল্পের আগে নিবেদন শুরু হয় না।
সংকল্পে স্থান ও তিথি, কর্তার নাম ও পরিবারের গোত্র এবং পূর্বপুরুষের নাম বলা হয়। সাধারণত পিতৃকুলের তিন প্রজন্ম—পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ—এবং একইভাবে মাতৃকুলের নাম নেওয়া হয়। পরিবারের ইচ্ছা থাকলে পাণ্ডাজি আরও পূর্ববর্তী প্রজন্মকেও যুক্ত করতে পারেন।
গোত্র পরিবারের ঋষিপরম্পরার পরিচয়; সংকল্পে তা উল্লেখ করা হয়। গোত্র জানা না থাকলে নিজে থেকে কোনও নাম ধরে নেবেন না। আগে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের জিজ্ঞাসা করুন বা পারিবারিক নথি দেখুন। তথ্য না পাওয়া গেলে পুরোহিতকে স্পষ্ট করে জানান। কিছু পরম্পরায় কাশ্যপ গোত্র ব্যবহারের রীতি আছে; আপনাদের ক্ষেত্রে কোন সংকল্প প্রযোজ্য, পুরোহিত স্থির করবেন।
সেদিন ধাপে ধাপে কী হয়
পারিবারিক রীতি, বেদি ও পাণ্ডাজির নির্দেশ অনুযায়ী আচারের ক্রম বদলাতে পারে। তবে গয়ার সাধারণ এক দিনের কর্ম মোটামুটি এইভাবে চলে: ভোরে স্নান ও সংকল্প, সাধারণত ফল্গুতীরে। তারপর জল ও কালো তিল দিয়ে এক-এক প্রজন্মের পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ।
এরপর হাতে পিণ্ড গড়ে কুশের আসনে রাখা হয়। মন্ত্রপাঠের সঙ্গে প্রতিটি পূর্বপুরুষের নাম করে অর্পণ করা হয়; সঙ্গে তিল, জল, মধু, দুধ ও ঘি দেওয়া হয়। নদীতীরের কর্মের পরে বিষ্ণুপদ মন্দিরে ভগবান বিষ্ণুর চরণচিহ্নের সামনে পিণ্ড অর্পণ। শেষে অক্ষয়বটে বিধির সমাপন এবং পাণ্ডাজির আশীর্বাদ গ্রহণ।
অনেকেই ব্রাহ্মণভোজন ও দানের মধ্য দিয়ে দিনের আচার শেষ করেন। সামর্থ্য ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী বস্ত্র, অন্ন বা গোদান করা হয়। নিবেদিত পিণ্ড পরে কোথায় রাখা বা কীভাবে অর্পণ করা হবে, সে বিষয়ে পুরোহিত ও তীর্থস্থানের নিয়ম মানুন।
সঙ্গে কী আনবেন
চাল, যব, তিল, কুশ, ফুল, ঘি ও ধূপের মতো পুজোর সামগ্রীর ব্যবস্থা সাধারণত পাণ্ডাজি বা আয়োজকেরা করেন। আপনাদের সঙ্গে কী আনতে হবে, তা আগে জেনে নিন। বিশেষ করে পরিবারের নাম, গোত্র ও প্রয়াতজনের পরিচয় আপনাদেরই জানাতে হবে।
প্রথমত, তথ্য: কর্তার নাম, গোত্র, যতজন পূর্বপুরুষের নাম জানা আছে, তাঁদের নাম এবং জানা থাকলে মৃত্যুতিথি বা পুণ্যতিথি। দ্বিতীয়ত, পোশাক: পুরুষেরা সাধারণত ধুতি ও গামছা, মহিলারা সাদামাটা শাড়ি বা সালোয়ার পরেন। ভারী পোশাক এড়িয়ে সাদামাটা রং বেছে নেওয়া হয়। নদীতে স্নান থাকতে পারে বলে এক প্রস্থ শুকনো পোশাক রাখুন।
ব্যবহারিক বিষয়ও ভাবুন। ঘাট ও মন্দিরচত্বরে খালি পায়ে হাঁটতে হয়; পানীয় জল রাখুন এবং বয়স্ক সদস্যদের সহায়তার ব্যবস্থা করুন। কয়েক ঘণ্টা অসমান মাটিতে দাঁড়াতে ও বসতে হতে পারে। কর্তা সাধারণত কর্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ আহার করেন না; পরিবারের অন্যদের জন্য হালকা খাবার আলাদা রাখলে সুবিধা।
কত সময় লাগে
এক দিনের সাধারণ বিধিতে সংকল্প ও তর্পণ থেকে অক্ষয়বটের সমাপন পর্যন্ত মূল কর্মেই প্রায় তিন-চার ঘণ্টা লাগে। বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসা ও মন্দিরে অপেক্ষার সময় তার অতিরিক্ত। তাই পুরো সকাল খালি রাখুন; সেদিন আর কোনও জরুরি কর্মসূচি না রাখাই ভালো।
আমাদের আয়োজনে প্রধান বেদিগুলিতে তিন দিনের শ্রাদ্ধ এবং আরও বিস্তৃত সতেরো দিনের বিধিও রয়েছে। কোনটি পরিবারের জন্য উপযুক্ত, আগে জেনে নিন। পিতৃপক্ষে ভিড় বেশি থাকে, তাই যাতায়াত ও অপেক্ষার সময়ও বাড়ে। বছরের অন্য সময় তুলনায় শান্তভাবে কর্ম করা যায়। আসার পরিকল্পনা থাকলে গয়ায় পিণ্ডদানের বিবরণ পড়ুন—বেদি, পুরোহিত এবং যাত্রার প্রস্তুতি সেখানে জানতে পারবেন।