অসুরের নামে এক পবিত্র তীর্থ
গয়ার নাম গয়াসুরের সঙ্গে যুক্ত। বায়ুপুরাণের গয়ামাহাত্ম্যে তাঁর ভক্তি, তপস্যা ও যজ্ঞের জন্য দেহদানের কাহিনি রয়েছে। এই কাহিনি অনুযায়ী তাঁর দেহ থেকেই পবিত্র তীর্থভূমির সৃষ্টি।
প্রথমবার গয়ায় এলে এই কাহিনি জানা থাকলে তীর্থটির তাৎপর্য বুঝতে সুবিধা হয়। কেন এখানে পিণ্ডদান হয়, বিষ্ণুপদ নামের তাৎপর্য কী এবং বিভিন্ন বেদির সঙ্গে কোন বিশ্বাস জড়িয়ে আছে-এসব বুঝতে সাহায্য করে।
বিষ্ণুভক্ত গয়াসুরের তপস্যা
পুরাণে গয়াসুরকে বিশালদেহী অসুর এবং ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি কোলাহল পর্বতে কঠোর তপস্যা করেন। কাহিনিতে তাঁর ভক্তি ও তপস্যার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু বর দিতে চাইলে গয়াসুর প্রার্থনা করেন, তাঁর দেহ যেন সমস্ত তীর্থের চেয়েও পবিত্র হয়। তাঁকে দর্শন বা স্পর্শ করলেই যেন সকল জীব পাপমুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করে। কাহিনি অনুযায়ী, বিষ্ণু সেই বর দেন।
বরের ফলে দেবতাদের উদ্বেগ
বরপ্রাপ্তির পরে গয়াসুরকে দর্শন বা স্পর্শ করেই মানুষ বৈকুণ্ঠে যেতে লাগল-নিজ নিজ কর্মফলের বিচার ছাড়াই। কাহিনিতে বলা হয়, যমলোক শূন্য হতে থাকল এবং কর্মফলের নিয়মে বিঘ্ন ঘটল।
যমসহ দেবতারা ব্রহ্মার কাছে গেলেন। বিষ্ণুর দেওয়া বর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়; গয়াসুরও শাস্তিযোগ্য কোনও অপরাধ করেননি। তাই তাঁর সম্মতি নিয়েই সমাধানের পথ খুঁজতে হল।
ব্রহ্মার প্রার্থনায় দেহদান
ব্রহ্মা গয়াসুরের কাছে এসে একটি মহাযজ্ঞের জন্য তাঁর দেহ প্রার্থনা করেন। যজ্ঞের জন্য পবিত্র ভূমি প্রয়োজন, আর বরপ্রাপ্ত গয়াসুরের দেহই সর্বাধিক পবিত্র। যজ্ঞ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে বলা হয়।
গয়াসুর সম্মত হয়ে উত্তরে মাথা ও দক্ষিণে পা রেখে শুয়ে পড়েন। পুরাণের বর্ণনায় তাঁর দেহ পাঁচ ক্রোশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। তাঁর শরীরে ব্রহ্মার যজ্ঞ শুরু হয়; দেবতারা ও মূর্তিমান তীর্থগুলিও সেখানে উপস্থিত হন।
ধর্মশিলা ও বিষ্ণুর পদচিহ্ন
যজ্ঞের সময় গয়াসুরের দেহ নড়ে উঠতে থাকে। কেন নড়েছিল, বিভিন্ন প্রচলিত কাহিনিতে তার ব্যাখ্যা আলাদা। স্থির ভূমি ছাড়া যজ্ঞ সম্পন্ন হবে না বলে তাঁর উপর ধর্মশিলা রাখা হয়। তাতেও দেহ সম্পূর্ণ স্থির হয় না।
তখন বিষ্ণু ধর্মশিলার উপর নিজের ডান পা রাখেন। গয়াসুর স্থির হন এবং যজ্ঞ সম্পন্ন হয়। শিলায় রয়ে যাওয়া সেই পদচিহ্নই বিষ্ণুপদ মন্দিরে পূজিত-এমনই স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস।
পিতৃপুরুষের কল্যাণে গয়াসুরের প্রার্থনা
যজ্ঞ শেষে বিষ্ণু আবার বর দিতে চাইলে গয়াসুর নিজের মুক্তির জন্য আলাদা কিছু চাননি। তিনি প্রার্থনা করেন, তাঁর দেহ থেকে সৃষ্ট এই ভূমিতে যাঁরা মা-বাবা ও পূর্বপুরুষের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদান করবেন, তাঁদের পিতৃপুরুষ যেন সদ্গতি লাভ করেন।
তিনি আরও চান, বিষ্ণু ও দেবতারা এই তীর্থে নিত্য বিরাজ করুন এবং ভূমিটি তাঁর নামেই পরিচিত হোক। এই বরপ্রাপ্তির কাহিনি থেকেই গয়ার মোক্ষভূমি হিসেবে মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করা হয়। পিতৃকুল ও মাতৃকুলের বহু প্রজন্মের কল্যাণের কথাও এই পরম্পরায় রয়েছে।
গয়াসুরের ভক্তি এবং অন্যের পূর্বপুরুষের কল্যাণকামনা এই কাহিনির মূল বিষয়। তাঁর দেহদানের সঙ্গে গয়ার পবিত্র তীর্থভূমির সৃষ্টি যুক্ত।
আজকের গয়ায় কাহিনির স্মৃতিস্থান
বিষ্ণুপদ মন্দিরে পদচিহ্ন, ফল্গুতীরে তর্পণ এবং অক্ষয়বটে সমাপন-একটি পরিবারের যাত্রাপথেই এই কাহিনির বিভিন্ন স্মৃতি মেলে। ফল্গুকে অন্তঃসলিলা নদী বলে স্মরণ করা হয়; অক্ষয়বটের সঙ্গে অক্ষয় আশীর্বাদের বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।
গয়ার বিস্তৃত তীর্থক্ষেত্রে আরও বহু বেদি রয়েছে। পরিবারের পরিস্থিতি ও নির্বাচিত বিধি অনুযায়ী গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিত কর্মের স্থান ও ক্রম ঠিক করেন। প্রতিটি স্থানে কোন আচার হয় এবং তার তাৎপর্য কী, তা তাঁর কাছ থেকে জেনে নেওয়া যায়।
পিণ্ডদান করতে আসা পরিবারের কাছে এর অর্থ
গয়া শ্রাদ্ধ পিতৃপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও পিতৃঋণের সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় কর্তব্য। গয়াসুরের বরপ্রাপ্তির কাহিনি এই তীর্থের বিশেষ মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করে। অনেক পরিবার প্রয়াতজনের মৃত্যুর বহু বছর পরেও এখানে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করতে আসেন।
পরিবারের একজন কর্তা সংকল্প ও নিবেদন করেন; অন্যরা তাঁর সঙ্গে অংশ নিতে পারেন। ভাত বা যবের আটা দিয়ে পিণ্ড, তিল, জল, কুশ এবং পূর্বপুরুষের নাম-এই সাধারণ উপকরণেই কর্ম হয়। পিতৃপক্ষে ভিড় বেশি হলেও গয়ার মাহাত্ম্য কেবল ওই সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মানা হয় না।
কাহিনির সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলিতে পরিবার নিয়ে আসতে চাইলে ফল্গু, বিষ্ণুপদ ও অক্ষয়বটে পিণ্ডদানের ব্যবস্থা দেখতে পারেন। আমাদের পুরোহিত পূজার সময় বিধি বোঝান। বাড়ির প্রস্তুতি ও মোট খরচ-সহ ব্যবস্থা বুকিংয়ের আগে লিখে জানাই, যাতে কী হবে তা আগেই জানা থাকে।