গয়াসুরের কাহিনি: গয়া কেন পিতৃমুক্তির পুণ্যভূমি

বায়ুপুরাণের গয়ামাহাত্ম্যে গয়াসুরের তপস্যা, তাঁর শরীরে দেবতাদের যজ্ঞ এবং বিষ্ণুর পদচিহ্নের কাহিনি রয়েছে। গয়ায় পিণ্ডদান করতে আসা পরিবারের কাছে সেই পুরাণকথার তাৎপর্য কী, এখানে তারই পরিচয়।

পড়তে প্রায় 6 মিনিট লাগবেসর্বশেষ সংশোধন 2026-08-11মূল লেখার ধর্মীয় পরামর্শদাতা ওঙ্কারনাথ অগ্নিবার, গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিত, গয়া — গয়া শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান, তর্পণ ও পিতৃকর্মে 40 বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাপরিবারের আস্থা5মূল্যায়ন · Google

অসুরের নামে এক পবিত্র তীর্থ

ভারতের অনেক তীর্থের নাম নদী, দেবতা বা ঋষির নামে। গয়ার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন গয়াসুর। গয়ামাহাত্ম্যে তাঁর কাহিনি কেবল পরাজয়ের নয়—গভীর ভক্তি, তপস্যা এবং আত্মনিবেদনের। পুরাণকথায় তাঁর দেহই তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে।

প্রথমবার গয়ায় এলে এই কাহিনি জানা থাকলে তীর্থটির তাৎপর্য বুঝতে সুবিধা হয়। কেন এখানে পিণ্ডদান হয়, বিষ্ণুপদ নামের তাৎপর্য কী এবং বিভিন্ন বেদির সঙ্গে কোন বিশ্বাস জড়িয়ে আছে—এসব বুঝতে সাহায্য করে।

বিষ্ণুভক্ত গয়াসুরের তপস্যা

পুরাণকথায় গয়াসুর বিশালদেহী অসুর, কিন্তু তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্রে ধ্বংস নয়, বিষ্ণুভক্তি। কোলাহল পর্বতে তিনি কঠোর তপস্যা করেন। এখানে ‘অসুর’ তাঁর বংশপরিচয়; চরিত্রের সরল বিচার নয়।

তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু বর দিতে চাইলে গয়াসুর প্রার্থনা করেন, তাঁর দেহ যেন সমস্ত তীর্থের চেয়েও পবিত্র হয়। তাঁকে দর্শন বা স্পর্শ করলেই যেন সকল জীব পাপমুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করে। কাহিনি অনুযায়ী, বিষ্ণু সেই বর দেন।

বরের ফলে দেবতাদের উদ্বেগ

বরপ্রাপ্তির পরে গয়াসুরকে দর্শন বা স্পর্শ করেই মানুষ বৈকুণ্ঠে যেতে লাগল—নিজ নিজ কর্মফলের বিচার ছাড়াই। কাহিনিতে বলা হয়, যমলোক শূন্য হতে থাকল এবং কর্মফলের নিয়মে বিঘ্ন ঘটল।

যমসহ দেবতারা ব্রহ্মার কাছে গেলেন। বিষ্ণুর দেওয়া বর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়; গয়াসুরও শাস্তিযোগ্য কোনও অপরাধ করেননি। তাই তাঁর সম্মতি নিয়েই সমাধানের পথ খুঁজতে হল।

ব্রহ্মার প্রার্থনায় দেহদান

ব্রহ্মা গয়াসুরের কাছে এসে একটি মহাযজ্ঞের জন্য তাঁর দেহ প্রার্থনা করেন। যজ্ঞের জন্য পবিত্র ভূমি প্রয়োজন, আর বরপ্রাপ্ত গয়াসুরের দেহই সর্বাধিক পবিত্র। যজ্ঞ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে বলা হয়।

গয়াসুর সম্মত হন। উত্তরে মাথা ও দক্ষিণে পা রেখে তিনি শুয়ে পড়েন; পুরাণবর্ণনায় তাঁর দেহ পাঁচ ক্রোশ ভূমিজুড়ে বিস্তৃত। তাঁর শরীরে ব্রহ্মার যজ্ঞ শুরু হয়, দেবতারা এবং তীর্থগুলি মূর্ত রূপে সেখানে উপস্থিত হন।

ধর্মশিলা ও বিষ্ণুর পদচিহ্ন

যজ্ঞের সময় গয়াসুরের দেহ নড়ে উঠতে থাকে। কেন নড়েছিল, বিভিন্ন প্রচলিত কাহিনিতে তার ব্যাখ্যা আলাদা। স্থির ভূমি ছাড়া যজ্ঞ সম্পন্ন হবে না বলে তাঁর উপর ধর্মশিলা রাখা হয়। তাতেও দেহ সম্পূর্ণ স্থির হয় না।

তখন বিষ্ণু ধর্মশিলার উপর নিজের ডান পা রাখেন। গয়াসুর স্থির হন এবং যজ্ঞ সম্পন্ন হয়। শিলায় রয়ে যাওয়া সেই পদচিহ্নই বিষ্ণুপদ মন্দিরে পূজিত—এমনই স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস।

গয়াসুর নিজের জন্য কী চেয়েছিলেন

যজ্ঞ শেষে বিষ্ণু আবার বর দিতে চাইলে গয়াসুর নিজের মুক্তির জন্য আলাদা কিছু চাননি। তিনি প্রার্থনা করেন, তাঁর দেহ থেকে সৃষ্ট এই ভূমিতে যাঁরা মা-বাবা ও পূর্বপুরুষের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদান করবেন, তাঁদের পিতৃপুরুষ যেন সদ্গতি লাভ করেন।

তিনি আরও চান, বিষ্ণু ও দেবতারা এই তীর্থে নিত্য বিরাজ করুন এবং ভূমিটি তাঁর নামেই পরিচিত হোক। এই বরপ্রাপ্তির কাহিনি থেকেই গয়ার মোক্ষভূমি হিসেবে মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করা হয়। পিতৃকুল ও মাতৃকুলের বহু প্রজন্মের কল্যাণের কথাও এই পরম্পরায় রয়েছে।

এই দৃষ্টিতে গয়াসুর কেবল দেবতার পদতলে পরাজিত কোনও চরিত্র নন। তিনি এমন এক ভক্ত, যিনি অন্যের পূর্বপুরুষের কল্যাণ চেয়েছিলেন। তাঁর আত্মনিবেদনের ফলেই এই তীর্থভূমির সৃষ্টি—কাহিনিতে এমনই বলা হয়।

আজকের গয়ায় কাহিনির স্মৃতিস্থান

বিষ্ণুপদ মন্দিরে পদচিহ্ন, ফল্গুতীরে তর্পণ এবং অক্ষয়বটে সমাপন—একটি পরিবারের যাত্রাপথেই এই কাহিনির বিভিন্ন স্মৃতি মেলে। ফল্গুকে অন্তঃসলিলা নদী বলে স্মরণ করা হয়; অক্ষয়বটের সঙ্গে অক্ষয় আশীর্বাদের বিশ্বাস জড়িয়ে আছে।

এর বাইরে বিস্তৃত তীর্থক্ষেত্রে আরও বহু বেদি রয়েছে। পরিবারের পরিস্থিতি অনুযায়ী গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিত কর্মের স্থান ও ক্রম নির্ধারণ করেন। প্রথমবার যাঁরা আসেন, তাঁদের সব বেদির নাম মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই; কোথায় কেন যাচ্ছেন, তা বুঝে নেওয়াই যথেষ্ট।

পিণ্ডদান করতে আসা পরিবারের কাছে এর অর্থ

গয়াশ্রাদ্ধ কেবল শোকপ্রকাশ নয়, পিতৃঋণ স্বীকারের ধর্মীয় কর্ম। গয়াসুরের বরপ্রাপ্তির বিশ্বাস এই তীর্থকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। সেই কারণেই অনেকেই প্রিয়জনের মৃত্যুর বহু বছর পরেও গয়ায় আসেন। আয়োজনের জাঁকজমকের চেয়ে শান্তভাবে যথাযথ বিধি পালন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের একজন কর্তা সংকল্প ও নিবেদন করেন; অন্যরা তাঁর সঙ্গে অংশ নিতে পারেন। ভাত বা যবের আটা দিয়ে পিণ্ড, তিল, জল, কুশ এবং পূর্বপুরুষের নাম—এই সাধারণ উপকরণেই কর্ম হয়। পিতৃপক্ষে ভিড় বেশি হলেও গয়ার মাহাত্ম্য কেবল ওই সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মানা হয় না।

পুরাণপরম্পরার দৃষ্টিতে এই যাত্রা প্রয়াতজনের উদ্দেশে জীবিত পরিবারের শ্রদ্ধার নিবেদন। গয়ায় পিণ্ডদান কেন নির্দিষ্ট বেদিতে নির্দিষ্ট ক্রমে হয়, গয়াসুরের কাহিনি সেই ভাবনাটিকেই স্পষ্ট করে।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

গয়াসুর কি দুষ্ট অসুর ছিলেন?
গয়ামাহাত্ম্যে তিনি বিষ্ণুর পরম ভক্ত হিসেবে স্মরণীয়। ব্রহ্মার প্রার্থনায় স্বেচ্ছায় যজ্ঞের জন্য দেহ দেন এবং অন্যের পূর্বপুরুষের কল্যাণে বর চান। তাঁর বংশপরিচয় ও চরিত্রকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
মন্দিরের নাম বিষ্ণুপদ কেন?
‘পদ’ অর্থ পা বা পদচিহ্ন। গয়াসুরকে স্থির রাখতে বিষ্ণু ধর্মশিলায় পা রেখেছিলেন এবং সেই চিহ্ন শিলায় রয়ে যায়—এমনই কাহিনি। এই পূজিত পদচিহ্নকে কেন্দ্র করেই বিষ্ণুপদ মন্দির।
পিণ্ডদান করতে হলে কি এই কাহিনি জানা বাধ্যতামূলক?
না। পাণ্ডাজি সংকল্প ও প্রতিটি ক্রিয়া বুঝিয়ে দেবেন। কাহিনি জানলে তীর্থস্থানগুলির তাৎপর্য বুঝতে সুবিধা হয়; কর্ম করার শর্ত হিসেবে তা মুখস্থ রাখতে হয় না।
শুধু পিতৃপক্ষেই কি গয়ায় পিণ্ডদান হয়?
পিতৃপক্ষ সবচেয়ে পরিচিত ও ব্যস্ত সময়। তবে গয়ায় বছরের অন্য সময়েও শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান হয়। কম ভিড় ও পরিবারের সুবিধার কথা ভেবে অনেকেই অন্য সময় বেছে নেন।
পিণ্ডদান কি শুধু সদ্য প্রয়াত ব্যক্তির জন্য?
না। গয়ার তীর্থশ্রাদ্ধে মা-বাবা, পিতামহ-মাতামহ ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের উদ্দেশেও নিবেদন করা হয়। প্রিয়জনের মৃত্যুর বহু বছর পরেও অনেকে পরিবার নিয়ে গয়ায় আসেন। সদ্য প্রয়াত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আগে সম্পন্ন কর্মের বিবরণ জানিয়ে উপযুক্ত বিধি নিশ্চিত করুন।

গয়া শ্রাদ্ধ / পিণ্ডদান করানোর ব্যবস্থা

এই কর্মে কী কী হয়, কত খরচ এবং সেই খরচে কী অন্তর্ভুক্ত—সব তথ্য স্পষ্ট করে দেওয়া আছে।

গয়া শ্রাদ্ধ / পিণ্ডদান — সম্পূর্ণ বিবরণ

আপনাদের পরিবারের পিতৃকর্ম নিয়ে কোনও প্রশ্ন আছে?

আপনাদের পরিস্থিতি বলুন। গয়ার পাণ্ডাজি পরিবারের জন্য উপযুক্ত বিধি সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন। এই পরামর্শ বিনামূল্যে; এরপর বুকিং করতেই হবে, এমন কোনও শর্ত নেই।

পরামর্শের জন্য ফোন করুন

আরও পড়ুন

+91 77177 85996WhatsApp
গয়াসুরের কাহিনি: গয়া কেন পিতৃমুক্তির পুণ্যভূমি