পুত্র না থাকলে শ্রাদ্ধের পথ বন্ধ নয়
বাবার কেবল কন্যাসন্তান, ভাই অবিবাহিত অবস্থায় মারা গিয়েছেন, অথবা কাকার কোনও সন্তান ছিল না—এমন পরিবারে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, শ্রাদ্ধ কে করবেন? ‘ছেলে ছাড়া হয় না’ শুনে অনেকে অকারণ অপরাধবোধেও ভোগেন।
পুত্র না থাকা পরিবারের ব্যর্থতা নয়। বিভিন্ন পরম্পরায় অন্য আত্মীয়ের মাধ্যমে কর্মের বিধান আছে। কে কর্তা হবেন এবং কীভাবে সংকল্প হবে, তা আগে ঠিক করে নিতে হয়।
গয়ায় নানা পারিবারিক পরিস্থিতিতে মানুষ পিতৃকর্ম করতে আসেন। কর্তা ও প্রয়াতজনের সম্পর্ক, পারিবারিক রীতি এবং আগে হওয়া কর্মের তথ্য শুনে গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিত প্রযোজ্য ব্যবস্থা জানান।
কন্যার ভূমিকা ও সীতার দৃষ্টান্ত
অনেক পরিবারে কন্যাই এই দায়িত্ব নেন। গয়ার প্রচলিত সীতাকথায় দশরথের উদ্দেশে সীতার পিণ্ড অর্পণের ঘটনাটি মেয়েদের কর্তা হওয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়।
পিতৃপক্ষসহ বছরের বিভিন্ন সময়ে কন্যারা গয়ায় পিণ্ডদান করেন। কোথাও একজন আত্মীয় সঙ্গে বসেন, কোথাও নারী নিজেই সম্পূর্ণ কর্ম করেন। নারী কর্তা সম্পর্কে আলাদা প্রবন্ধে এই রীতিভেদ ও আগে জিজ্ঞাসা করার বিষয়গুলি বিস্তারিত রয়েছে।
জামাতা ও দৌহিত্র
কন্যার পুত্রকে বলা হয় দৌহিত্র। বহু পরিবারে মাতামহ-মাতামহীর উদ্দেশে তাঁর শ্রাদ্ধ করার রীতি রয়েছে। জামাতার মাধ্যমেও কোনও কোনও পরম্পরায় কর্ম হয়।
এই রীতির ধর্মীয় ব্যাখ্যায় কন্যার সন্তানদেরও পরিবারের ধারার অংশ হিসেবে দেখা হয়। তাই মাতৃকুলের সঙ্গে দৌহিত্রের সম্পর্ককে শ্রাদ্ধকর্মে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দৌহিত্র ছোট হলে বা যেতে না পারলে কোনও পরিবারে জামাতা দায়িত্ব নেন। তবে সম্পর্ক অনুযায়ী সংকল্পের ভাষা বদলায়। পরিবার ও পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে সেটি স্থির করুন।
পৌত্র ও প্রপৌত্র
পুত্র আগে প্রয়াত হলে বা কর্ম করতে অক্ষম হলে অনেক পরম্পরায় পৌত্র, অর্থাৎ পুত্রের পুত্র, দায়িত্ব নেন। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের প্রপৌত্রের মাধ্যমেও পূর্বপুরুষের উদ্দেশে কর্ম হতে পারে।
অনেকে প্রপিতামহ বা আরও আগের প্রজন্মের জন্য গয়ায় আসেন। যাঁদের নাম জানা আছে, তাঁদের নাম ও সম্পর্ক জানিয়ে পৌত্র বা প্রপৌত্র একাধিক পূর্বপুরুষের উদ্দেশে সংকল্প করতে পারেন; বিস্তারিত পুরোহিত ঠিক করেন।
ভাই, ভাইপো ও অন্য আত্মীয়
সরাসরি উত্তরসূরি না থাকলে ভাই, ভাইপো বা অন্য নিকটাত্মীয়ের ভূমিকা বিবেচিত হয়। একই কুলের অন্য আত্মীয়ের মাধ্যমেও নির্দিষ্ট পরম্পরায় কর্ম সম্পন্ন করা হয়।
অবিবাহিত অবস্থায় প্রয়াত বা নিঃসন্তান আত্মীয়ের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন বেশি আসে। কে দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক এবং তাঁর সম্পর্ক কী, তা পুরোহিতকে জানান; সম্পর্কের ভিত্তিতে বিধি নির্ধারিত হবে।
সমান সম্পর্কের একাধিক আত্মীয় থাকলে একজনকে কর্তা হিসেবে আগে ঠিক করুন। অন্যরা সঙ্গে অংশ নিতে পারেন। আগে পরিবারে আলোচনা করে নিলে ঘাটে পৌঁছে এ নিয়ে মতবিরোধ হওয়ার আশঙ্কা কমে।
স্বামীর জন্য স্ত্রী, স্ত্রীর জন্য স্বামী
অনেক পরিবারে স্ত্রী প্রয়াত স্বামীর উদ্দেশে কর্ম করেন, বিশেষত পুত্র না থাকলে বা ছোট হলে। পুরোহিত তাঁকে সংকল্প ও নিবেদনের ধাপগুলি বুঝিয়ে দেন।
অন্য পরিবারে ভাই, ভাইপো বা অন্য আত্মীয় কর্তা হন এবং স্ত্রী সঙ্গে অংশ নেন। এই রীতিভেদকে কারও মর্যাদার বিচার হিসেবে না দেখে, নিজেদের জন্য কী হবে তা আগেই স্পষ্ট করুন।
প্রয়াত স্ত্রীর উদ্দেশে স্বামীও কর্ম করেন। সন্তান থাকলে কোনও পরিবারে পুত্র বা কন্যা দায়িত্ব নেন। কে উপস্থিত থাকতে পারবেন এবং পারিবারিক রীতি কী, তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা হয়।
দত্তকপুত্রের ক্ষেত্রে
দত্তকপুত্রও তাঁর পালক মা-বাবার শ্রাদ্ধ করতে পারেন—এমন ধর্মীয় বিধান রয়েছে। পরিবারের এই সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তি না রেখে, পুরোহিতকে প্রয়োজনীয় পরিচয় জানান।
জন্মদাতা মা-বাবার জন্যও কর্ম করতে চাইলে আলাদাভাবে আলোচনা করুন। এ বিষয়ে পরম্পরায় পার্থক্য থাকতে পারে; প্রযোজ্য সংকল্প ও করণীয় অনুমান করে স্থির করবেন না।
পরিবারে উপযুক্ত কেউ অবশিষ্ট না থাকলে
কখনও কোনও পারিবারিক শাখায় আর উত্তরসূরি থাকেন না, অথবা যাঁরা আছেন তাঁদের পক্ষে কর্ম করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ভাবেন, আর কোনও পথ নেই।
কিছু পরম্পরায় পুরোহিতের মাধ্যমে পরিবারের হয়ে শ্রাদ্ধ করারের বিধান রয়েছে। পরিবারের পরিচয়, গোত্র ও প্রয়াতজনের নাম যতটুকু জানা আছে, তা তীর্থপুরোহিতকে জানান। এই পরিস্থিতিতে সংকল্প ও শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তা তাঁর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করুন।
দূরে থাকা বা বয়সজনিত কারণে যেতে না পারলেও আগে কর্তার উপস্থিতি, উপযুক্ত আত্মীয় এবং প্রতিনিধিত্বের বিধি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন। নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে দূর থেকে কর্ম হয়ে যাবে বলে ধরে নেবেন না। কোথায়, কার নামে ও কী বিধিতে কর্ম হবে, স্পষ্ট জানা জরুরি।
শ্রদ্ধার পাশাপাশি বিধি নিশ্চিত করাও জরুরি
শ্রাদ্ধের সঙ্গে শ্রদ্ধার ভাবটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তরিকতা মুখ্য; পাশাপাশি কর্তা ও প্রয়াতজনের সম্পর্ক অনুযায়ী সংকল্প এবং কর্মের ক্রম নির্ধারিত হয়। দুটিকেই গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিন।
অঞ্চল, সম্প্রদায় ও পরিবারভেদে রীতি আলাদা। একটি সাধারণ প্রবন্ধ সম্ভাব্য পথগুলি বুঝিয়ে দিতে পারে, কিন্তু আপনাদের নিজস্ব বিধি নির্ধারণ করতে পারে না।
যাত্রার আগে পুরোহিতকে বলুন কে প্রয়াত হয়েছেন, পরিবারে কারা আছেন এবং কে দায়িত্ব নিতে চান। বাংলা ভাষায় ব্যাখ্যা দরকার হলে সেটিও জানান। প্রয়োজন হলে আমাদের মাধ্যমে প্রাথমিক আলোচনার ব্যবস্থা চাইতে পারেন।
বহু বছর কর্ম না হলে নিজেকে বা পরিবারকে দোষারোপ করবেন না। আগের তথ্য যতটুকু জানা আছে তা নিয়েই আলোচনা শুরু করা যায়। গয়ায় পিণ্ডদানের ব্যবস্থা করার প্রথম ধাপ হল নিজেদের পরিস্থিতি পরিষ্কার করে বলা।