
পুণ্যস্থান
প্রেতশিলা
বিষ্ণুপদ থেকে প্রায় 8 কিমি উত্তরের পাথুরে পাহাড়। গয়া মাহাত্ম্যে ধর্মরাজের প্রতিষ্ঠিত এই প্রেতপর্বতে পিণ্ড ও ছাতু নিবেদনের মাধ্যমে অকালে প্রয়াত আত্মার প্রেতদশা থেকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে।
পূর্বপুরুষের প্রতি আমাদের ঋণ
যাঁদের কাছে আমাদের সবকিছুর ঋণ, তাঁদের উদ্দেশে এই কর্ম পিতৃঋণ শোধের একটি পথ। পরিবারের উদ্দেশ্য জানান; ফোনে কথা বলে প্রতিটি ধাপ একসঙ্গে ঠিক করে নেব।
কোন পরিস্থিতিতে এখানে কর্ম হয়
প্রেতশিলা বা প্রেতপর্বত বিষ্ণুপদ থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে খাড়া গ্রানাইটের পাহাড়; গাড়িতে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ মিনিট। দুর্ঘটনা, জলে ডোবা, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, সাপের কামড়, আত্মহত্যা, বাড়ি থেকে দূরে মৃত্যু বা মৃত্যুর পরে বিধি অসম্পূর্ণ থাকা—এই ধরনের প্রয়াণের জন্য গয়াক্ষেত্রে এই বেদি নির্দিষ্ট। পরম্পরায় বলা হয়, এমন আত্মা এখনও পিতৃগণের মধ্যে স্থান পাননি; এখানকার পিণ্ডদান সেই সদ্গতির জন্য। বংশে এমন মৃত্যুর ঘটনা না থাকলে সাধারণত এখানে আসতে হয় না।
গয়া মাহাত্ম্যের বর্ণনা
বায়ুপুরাণের গয়া মাহাত্ম্যে গয়াসুরকে স্থির রাখা মহাধর্মশিলার বাম পাদের কাছে ধর্মরাজ যমের প্রতিষ্ঠিত প্রেতপর্বত ও পাশের প্রেতকুণ্ডের কথা আছে। সেখানে শ্রাদ্ধে পিতৃগণের প্রেতদশা থেকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে। কথিত আছে, রাম ও লক্ষ্মণ ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান করে এখানে দশরথের জন্য পিণ্ড অর্পণ করেন। শিখরে প্রেতরাজরূপী যমের মন্দিরটি 1787 সালে ইন্দোরের অহল্যাবাঈ হোলকর পুনর্নির্মাণ করেন; তিনিই বিষ্ণুপদ মন্দিরও পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।
ধর্মশিলা ও ছাতু নিবেদনের বিধি
শিখরের খোলা জায়গায় সিঁদুরচিহ্নিত বড় ধূসর শিলাটি রয়েছে; তার পাদদেশে খোদাই করা দেবমূর্তি। পাথরে তিনটি রেখাযুক্ত যে চরণচিহ্ন, পরম্পরায় সেটিকে ব্রহ্মার বলা হয়। একটি ফাটল যমলোক পর্যন্ত নেমে গেছে বলেও বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শোনা যায়। এখানে প্রয়াতজনের নামে পিণ্ড অর্পণের পরে কর্তা কালো তিল মেশানো ছাতু ছড়াতে ছড়াতে পাঁচবার শিলা প্রদক্ষিণ করেন। পাণ্ডারা স্থানীয় ভাষায় যে নিবেদন শেখান, তার ভাব—ছড়িয়ে দেওয়া এই ছাতু যেন পিতৃপুরুষের কাছে পৌঁছয়। প্রচলিত বিশ্বাসে, অশৌচে ছাতু খাওয়া হয় না এবং অকালমৃত্যুর অসমাপ্ত অশৌচ এই নিবেদনে শেষ হয়। তার পরেই পরিবার আবার ছাতু গ্রহণ করেন।
ব্রহ্মকুণ্ড ও আশপাশের বেদি
পাহাড়ের পাদদেশে ব্রহ্মকুণ্ড। ওঠার আগে পরিবার এখানে স্নান করে দিনের প্রথম পিণ্ড অর্পণ করেন। রামশিলা, রামকুণ্ড ও কাকবলি কাছাকাছি। সতেরো দিনের পিতৃপক্ষের ক্রমে এই পাঁচটি স্থানের কর্ম একই দিনে—ফল্গুর তর্পণের পরে, বিষ্ণুপদের আগে। পরম্পরার ব্যাখ্যায়, এখানে কর্মের মাধ্যমে বাধা কাটিয়ে আত্মার পথ উন্মুক্ত হয়, যাতে পরে প্রধান বেদিগুলির নিবেদন গ্রহণ করতে পারেন।
পাহাড়ে ওঠা ও সময়
ব্রহ্মকুণ্ড থেকে শিখরে 676টি পাথরের ধাপ। বয়স্কদের জন্য পাদদেশে ডুলি ভাড়া করা যায়। ভোরে রওনা দিন। দিনের আলোর মধ্যেই বেদির কাজ হয়; সন্ধ্যার আগে পাণ্ডারা নেমে আসেন, অন্ধকারে কেউ পাহাড়ে থাকেন না। পানীয় জল ও কুণ্ডে স্নানের পরে পরার শুকনো পোশাক রাখুন। পিতৃপক্ষে সকালজুড়ে সিঁড়িতে ভিড় থাকে; অন্য সময় তুলনায় শান্ত, এক সকালেই কর্ম হয়। অনেক পরিবার নামার আগে মন্দিরে বিষ্ণুর চরণে প্রয়াতজনের ছবিও রেখে আসেন।
গয়ার পুণ্যস্থান
গয়ায় যেখানে পিণ্ডদান হয়
বিষ্ণুপদ মন্দির
গয়ার প্রধান মন্দির। গয়াসুরকে স্থির রাখতে বিষ্ণু পাথরে যে চরণ রেখেছিলেন বলে পুরাণকথা, সেই চরণচিহ্নকে ঘিরেই মন্দির। গয়ার পিণ্ডদানে ভগবানের এই চরণে নিবেদন অন্যতম প্রধান কর্ম।
অক্ষয়বট
সীতাদেবীর আশীর্বাদে চিরজীবী বলে পূজিত বটগাছ। এর নীচে শেষ সুফল গ্রহণ না করলে গয়ার পিণ্ডদান অসম্পূর্ণ বলে মানা হয়। কথিত আছে, রামও এখানে দশরথের উদ্দেশে পিণ্ড অর্পণ করেছিলেন।
ফল্গু নদী
সীতাদেবীর পিতৃকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গয়ার পবিত্র নদী। প্রয়াত পূর্বজনের উদ্দেশে জল ও তিল দিয়ে ফল্গুতে তর্পণের মধ্য দিয়ে কর্ম শুরু হয়।
প্রেতশিলা
বিষ্ণুপদ থেকে 8 কিমি উত্তরের পাথুরে পাহাড়। দুর্ঘটনা বা অন্যভাবে অকালে প্রয়াত আত্মার জন্য এখানে কর্ম হয়। ধর্মশিলায় পিণ্ড ও ছাতু নিবেদনে প্রেতদশা থেকে মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাস।
গয়ার পুরাণকথা
বায়ুপুরাণে গয়ার কথা
বায়ুপুরাণের কথায়, অসুর গয়াসুর এমন কঠোর তপস্যা করেছিলেন যে তাঁর দেহই পবিত্র হয়ে উঠেছিল। যাঁরা তাঁকে স্পর্শ করতেন বা তাঁর দেহের ওপর মৃত্যুবরণ করতেন, সঙ্গে সঙ্গে মোক্ষলাভ করতেন। স্বর্গ পূর্ণ হতে লাগল, নরক শূন্য হল; সৃষ্টির স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বদলে গেল।
শৃঙ্খলা ফেরাতে দেবতারা গয়াসুরের দেহে মহাযজ্ঞ করার অনুমতি চাইলেন। তিনি সম্মত হয়ে আজকের গয়ার ভূমিতে শুয়ে পড়লেন। তবুও দেহ কাঁপতে থাকায় বিষ্ণু একটি পাথরের ফলকের ওপর চরণ রেখে তাঁকে স্থির করলেন। সেই চরণচিহ্ন ঘিরেই আজকের বিষ্ণুপদ মন্দির।
বিনিময়ে গয়াসুর বর চাইলেন—এই ভূমি যেন শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র হয়, যেখানে জীবিতের নিবেদনে প্রয়াতজন মুক্তি পান। বিষ্ণু সেই বর দিলেন। গয়া মাহাত্ম্যে তাই এখানকার পিণ্ডদানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পূর্বপুরুষের মুক্তির কথা বলা হয়েছে।
বায়ুপুরাণেই এই গয়া মাহাত্ম্য বর্ণিত। সেই বায়ুপুরাণ থেকে আমাদের নামের প্রেরণা, আর পিতৃকর্মের এই উদ্দেশ্যেই আমাদের আয়োজন।
কী প্রয়োজন, জানান
প্রতিটি আয়োজনে যা থাকে
- প্রেতশিলার কর্ম প্রয়োজন কি না পাণ্ডাজির পরামর্শ
- ছাতু, কালো তিল ও পিণ্ডের সামগ্রী
- পাহাড়ে ওঠার আগে ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান ও প্রথম পিণ্ড
- বয়স্কদের জন্য পাদদেশে ডুলির ব্যবস্থা
- বিষ্ণুপদ থেকে যাওয়া-আসার গাড়ি (20–25 মিনিট)
- বিষ্ণুপদ ও অক্ষয়বটের আগে দিনের প্রথম ভাগে কর্ম
গয়ার পাণ্ডাজিরা
যাঁদের তত্ত্বাবধানে আপনাদের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান
পরিচয় ও বংশপরম্পরা যাচাই করা গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিতেরা শাস্ত্রবিধি মেনে আপনাদের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করান।
পরিবারের সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্নোত্তর
কাদের প্রেতশিলায় যেতে হয়?
বংশে অকাল বা অস্বাভাবিক মৃত্যু—দুর্ঘটনা, জলে ডোবা, আগুন, সাপের কামড়, আত্মহত্যা, বাড়ির বাইরে মৃত্যু বা পরবর্তী বিধি অসম্পূর্ণ থাকার ক্ষেত্রে এই কর্মের কথা বলা হয়। এমন ঘটনা না থাকলে পাণ্ডাজি সাধারণত পাঠান না। প্রকৃত পরিস্থিতি জানিয়ে তাঁর নির্দেশ নিন।
কত দূর এবং ওঠা কতটা কঠিন?
বিষ্ণুপদ থেকে প্রায় 8 কিমি উত্তরে, গাড়িতে 20–25 মিনিট। ব্রহ্মকুণ্ড থেকে শিখরে 676টি ধাপ; বয়স্কদের ডুলি পাদদেশে ভাড়া করা যায়। ভোরে যান, দিনের আলো থাকতেই কর্ম শেষ করতে হয়।
ছাতু কেন দেওয়া হয়?
অশৌচে ছাতু খাওয়া হয় না—এই স্থানীয় পরম্পরায় অকালমৃত্যুর অসমাপ্ত অশৌচ ধর্মশিলায় ছাতু নিবেদনে শেষ হয় বলে বিশ্বাস। পিতৃপুরুষের কাছে ছাতু পৌঁছনোর প্রার্থনা করে এই বিধি এখানেই করা হয়।
সাধারণ গয়া পিণ্ডদানে কি প্রেতশিলা থাকে?
না। সাধারণ ক্রম ফল্গু, বিষ্ণুপদ ও অক্ষয়বট। এমন মৃত্যুর পরিস্থিতি থাকলে প্রেতশিলা যোগ হয়; সেটিই চার স্থানের পিণ্ডদান। সে ক্ষেত্রে পাহাড়ের কর্ম দিনের প্রথম ভাগে হয়।
এই বিধি সম্পর্কে আরও পড়ুন
সব প্রবন্ধএখান থেকেই শুরু
কোনও প্রশ্ন থাকলে বলুন, বুঝিয়ে দেব
মা-বাবার উদ্দেশে এই কর্ম আপনাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনও বিধি অসম্পূর্ণ রেখে নয়—প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে, আপনাদের সামনেই শাস্ত্র মেনে কর্ম সম্পন্ন হয়। খরচও শুরুতেই জানানো হয়। আগে কথা বলুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
শ্রাদ্ধে শ্রদ্ধার সঙ্গে বিধিও জরুরি।
শাস্ত্রবিধি মেনে কর্ম সম্পন্ন না হলে শ্রাদ্ধ অসম্পূর্ণ থেকে যায়—আন্তরিক শ্রদ্ধা থাকলেও।










