আচারগত আলোচনায় অকালমৃত্যু বলতে কী বোঝায়
দুর্ঘটনা, জলে ডোবা, আগুন, সর্পদংশন বা আত্মহত্যার মতো মৃত্যুর ক্ষেত্রে অকালমৃত্যু বা অপমৃত্যু শব্দ ব্যবহৃত হয়। অল্প বয়সে বা বিদেশে মৃত্যু হলেই একই বিধি প্রযোজ্য হবে—এমন নয়; বয়স, পরিস্থিতি ও আগে করা আচার বিবেচনা করতে হয়।
আচার নির্ধারণের জন্য মৃত্যুর পরিস্থিতি আলাদা করে দেখা হয়; এর মাধ্যমে প্রয়াত ব্যক্তির চরিত্র বা পরিবারের বিচার করা হয় না। শোকাহত পরিবারের প্রতি সম্মান রেখেই পরবর্তী কর্তব্য নিয়ে কথা বলা উচিত।
বিশেষ আচার নিয়ে আলোচনা হয় কেন
ধর্মীয় ব্যাখ্যায় মৃত্যুর পরবর্তী আচার ও সপিণ্ডীকরণের মাধ্যমে প্রয়াতজনকে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়। বার্ষিক শ্রাদ্ধ ও তর্পণের সঙ্গে সেই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা পরবর্তী আচার অসম্পূর্ণ থাকলে কীভাবে তা সম্পন্ন করা যাবে, সেটিই প্রথম প্রশ্ন। সাধারণ শ্রাদ্ধ যথেষ্ট কি না, তা না জেনে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই।
উদ্দেশ্য প্রয়াতজনের শান্তি কামনা এবং পরিবারের ধর্মীয় কর্তব্য সম্পন্ন করা। এর পরে বার্ষিক শ্রাদ্ধ কীভাবে পালন করবেন, তাও পুরোহিতের কাছে জেনে নিন।
প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের প্রসঙ্গ
গয়ার প্রেতশিলা একটি পাহাড়ি তীর্থ ও পিণ্ডদানের বেদি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে এখানে শ্রাদ্ধ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলে মানা হয়; আবার বিস্তৃত গয়াশ্রাদ্ধের সূচিতেও এটি থাকতে পারে।
পাহাড়ের নিচে ব্রহ্মসরোবর এবং ওপরে বেদি রয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার বিষয়টি বয়স্ক বা হাঁটাচলায় অসুবিধা আছে এমন সদস্যদের আগে জানান। স্নান ও নিবেদনের পদ্ধতি স্থানীয় নির্দেশ অনুযায়ী হবে।
কোন দিনে প্রেতশিলায় আচার হবে এবং বিষ্ণুপদ বা অক্ষয়বটের সঙ্গে এর ক্রম কী, তা নির্বাচিত আচারের সূচি অনুযায়ী ঠিক হয়। দীর্ঘ সূচিতে রামশিলা ও অন্যান্য তীর্থও থাকতে পারে।
নারায়ণ বলি ও প্রেতশিলা এক বিষয় নয়
প্রেতশিলা একটি তীর্থস্থান; নারায়ণ বলি একটি স্বতন্ত্র আচার। একটি নাম শুনে অন্যটি সম্পন্ন হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনও পরিবারের ক্ষেত্রে দুটিই সূচিতে থাকতে পারে।
নারায়ণ বলিতে নারায়ণের কাছে প্রয়াতজনের সদ্গতি প্রার্থনা করা হয়। আটা ও কুশের প্রতীকী দেহের মাধ্যমে অসম্পূর্ণ আচার সম্পন্ন করার বিধি প্রচলিত। এর পরেও পরিবারের বার্ষিক শ্রাদ্ধ চলতে পারে।
আচারের উদ্দেশ্য, কর্তা, সময় ও উপকরণ নিয়ে নারায়ণ বলির বিস্তারিত লেখাটি পড়ুন। আপনার পরিবারের প্রয়োজন অবশ্যই পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করুন।
দেহ পাওয়া যায়নি বা শেষকৃত্য অসম্পূর্ণ রয়েছে
প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দুর্ঘটনায় দেহ উদ্ধার না হলে পরিবার শেষ বিদায়ের সুযোগও পায় না। বহু বছর পরেও সেই অপূর্ণতার কথা মনে থাকতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রতীকী দেহের মাধ্যমে আচার করার বিধান রয়েছে। ঠিক কোন বিধি প্রযোজ্য, তা ঘটনার বিবরণ ও ইতিমধ্যে করা কাজ শুনে পুরোহিত জানাবেন।
দাহ হয়েছে, কিন্তু পরে শ্রাদ্ধ বা অন্য আচার হয়নি—এটিও জানাতে হবে। অসুস্থতা, পরিবারের বিচ্ছিন্ন থাকা বা কঠিন পরিস্থিতির কারণে কিছু বাদ পড়ে থাকলে তা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার দরকার নেই।
বিদেশে মৃত্যু বা দাহ হয়ে থাকলে
বিদেশে স্থানীয় ব্যবস্থায় দাহ বা সমাধি হয়েছে, পরিবারের পক্ষে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি, অথবা অস্থি দেশে আনা যায়নি—এমন পরিস্থিতি আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করুন।
বিদেশে মৃত্যু হয়েছে বলেই নারায়ণ বলি করতে হবে, এমন নয়। কী কী সম্পন্ন হয়েছে এবং পরিবারের পরম্পরায় কী বাকি রয়েছে, তা বিচার করে পরবর্তী আচার নির্ধারণ করতে হয়।
পরিবারের সকলের একসঙ্গে গয়ায় আসা সব সময় সম্ভব হয় না। কে কর্তা হবেন এবং কার উপস্থিতি প্রয়োজন, তা আগে ঠিক করুন; দূর থেকে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা আছে কি না, আলাদা করে নিশ্চিত করুন।
যাত্রার আগে চারটি কাজ
প্রথমে প্রয়াতজনের নাম, গোত্র, মৃত্যুর তারিখ বা জানা তিথি এবং যতদূর জানা আছে পূর্বপুরুষদের নাম লিখে রাখুন। অজানা তথ্য আন্দাজ করে পূরণ করবেন না।
এর পরে গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিতকে মৃত্যুর পরিস্থিতি, দাহ হয়েছে কি না, পরবর্তী আচার এবং ইতিমধ্যে করা শ্রাদ্ধের কথা জানান। প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত আলোচনা গোপনীয়ভাবে করার অনুরোধ করতে পারেন।
পুরোহিতের পরামর্শে আচার, বেদি, ক্রম ও দিনসংখ্যা স্থির করুন। নারায়ণ বলি, প্রেতশিলায় পিণ্ডদান বা ত্রিপিণ্ডী—সব পরিবারের জন্য সবগুলি দরকার হয় না।
কে কর্তা হবেন এবং পরিবারের আর কারা সঙ্গে যাবেন, তা ঠিক করুন। স্নানের পরে বদলানোর পোশাক রাখুন এবং প্রেতশিলায় ওঠার সামর্থ্য অনুযায়ী সূচি করুন। কন্যা বা অন্য আত্মীয় কর্তা হলে পারিবারিক বিধি আগে মিলিয়ে নিন।
শোকের সঙ্গে ভয় বা অপরাধবোধ যোগ করবেন না
কঠিন পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছে বলে পরামর্শ চাইতে সংকোচ করবেন না। কী করা সম্ভব এবং কী প্রয়োজন, তা জানার অধিকার পরিবারের রয়েছে।
প্রয়াতজনের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই এই উদ্যোগের ভিত্তি। ভয় দেখিয়ে অতিরিক্ত আচার চাপিয়ে দেওয়া বা নিশ্চিত পার্থিব ফলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নয়।