তর্পণের মূল ভাব: তৃপ্তি কামনা
তর্পণ শব্দের সঙ্গে তৃপ্তির ধারণা যুক্ত। যাঁদের স্মরণ করা হচ্ছে, তাঁদের উদ্দেশে জল নিবেদন করে তৃপ্তি ও শান্তি প্রার্থনা করা হয়।
প্রতিবার নাম ও সম্পর্ক অনুযায়ী পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। পুরোহিত মন্ত্র ও ক্রম বলে দেন, কর্তা সেই অনুযায়ী জল নিবেদন করেন।
অনেক শ্রাদ্ধবিধিতে পিণ্ড নিবেদনের আগে তর্পণ হয়। তবে পুরো ক্রমটি অনুসৃত বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
জলের সঙ্গে তিল ও কুশ কেন
জল তর্পণের প্রধান উপকরণ। ধর্মীয় আচারে এটি পবিত্র নিবেদন হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং পূর্বপুরুষদের তৃপ্তির কামনায় অর্পণ করা হয়।
পিতৃকর্মে কালো তিলের বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। তিলকে পবিত্র বলে মানা হয়; সেই বিশ্বাস থেকেই তর্পণের জল, পিণ্ড ও দানে এর ব্যবহার রয়েছে।
কুশ হাতে রাখা বা কুশের আংটি পরার বিধান দেখা যায়। কখন ও কীভাবে তা ব্যবহার করতে হবে, পুরোহিত দেখিয়ে দেন।
দেব, ঋষি ও পিতৃ তর্পণ
বিস্তৃত তর্পণবিধিতে দেবতা, ঋষি এবং পূর্বপুরুষদের পৃথকভাবে স্মরণ করা হয়। দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণের ধারণার সঙ্গে এই ক্রমের সম্পর্ক রয়েছে।
কার উদ্দেশে নিবেদন হচ্ছে, সেই অনুযায়ী বসার দিক, পৈতের অবস্থান এবং হাত দিয়ে জল ছাড়ার পদ্ধতি বদলাতে পারে।
আচারের মাঝখানে পুরোহিত দিক বা পৈতের অবস্থান পরিবর্তন করতে বললে তার কারণ এই পৃথক নিবেদন। না বুঝলে সংক্ষেপে অর্থটি জেনে নিতে পারেন।
দিক, পৈতে ও হাতের ভঙ্গি
পিতৃতর্পণে সাধারণত দক্ষিণমুখী হয়ে বসা হয়। যাঁরা পৈতে পরেন তাঁরা সেটি ডান কাঁধে অপসব্যভাবে রাখেন। বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ার কাছে পিতৃতীর্থ নামে পরিচিত অংশ দিয়ে জল ছাড়া হয়। সঙ্গে কালো তিল ও কুশ ব্যবহার করা হয়।
দেবতর্পণে পূর্বমুখী হওয়া ও হাতের অন্য অংশ দিয়ে জল দেওয়ার রীতি দেখা যায়। ঋষিতর্পণের ভঙ্গিও আলাদা হতে পারে।
কতবার জল দেবেন, দাঁড়িয়ে না বসে তর্পণ করবেন, কী উপকরণ লাগবে এবং কোন ক্রম মানবেন-এসব অঞ্চল, সম্প্রদায় ও পারিবারিক পরম্পরাভেদে বদলায়।
এটি তর্পণের সাধারণ পরিচয়। গয়ায় তর্পণ ও পিণ্ডদান করাতে চাইলে বায়ু নাম-গোত্র, সামগ্রী ও পূজার প্রস্তুতিতে সাহায্য করে। আমাদের পুরোহিত পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বিধি বুঝিয়ে পূজা করান। গয়াশ্রাদ্ধের ব্যবস্থা ও খরচ দেখুন।
মন্ত্র আগে থেকে মুখস্থ থাকা আবশ্যক নয়। যেখানে মন্ত্র বলতে হয়, পুরোহিতের পরে অল্প অল্প করে বলুন এবং প্রয়োজনে অর্থ জিজ্ঞেস করুন।
পূর্বপুরুষের নাম ও গোত্র
অনেক বিধিতে পিতৃকুলের তিন প্রজন্ম এবং মাতৃকুলের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। প্রয়াত নারী ও অন্য আত্মীয়দের নাম কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা পরিবারের পদ্ধতি অনুযায়ী জানুন।
গোত্র পরিবারের ঋষিপরম্পরার পরিচয়। নাম, গোত্র ও প্রয়াতজনের সঙ্গে সম্পর্ক সংকল্পে উল্লেখ করা হয়। যে তথ্য জানা আছে, তা লিখে রাখুন; কোনও তথ্য অজানা থাকলে বায়ুকে জানান।
নামগুলি লিখে রাখলে পরিবারের স্মৃতিও সংরক্ষিত হয়। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে সঠিক নাম ও সম্পর্ক জেনে নেওয়া তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।
কখন তর্পণ করা হয়
কিছু পরিবারে নিত্যকর্মের অংশ হিসেবে স্নানের পরে তর্পণ করা হয়। সবার দৈনন্দিন অভ্যাস এক নয়।
পিতৃপক্ষ, মৃত্যুতিথির শ্রাদ্ধ, অমাবস্যা এবং গয়ার মতো তীর্থে শ্রাদ্ধের সময় তর্পণের প্রচলন রয়েছে।
বাবা-মা জীবিত থাকলে কার উদ্দেশে কোন বিধি প্রযোজ্য এবং বছরে কোন দিনগুলি পালন করবেন, তা নিজের পরম্পরা অনুযায়ী জেনে নিন।
গয়ায় তর্পণের স্থান
গয়াশ্রাদ্ধে স্নান ও সংকল্পের পরে ফল্গুর তীরে তর্পণ করা হয়। এর সঙ্গে পিণ্ড প্রস্তুত ও নিবেদনের পৃথক ধাপ থাকে।
এক দিন, তিন দিন ও সতেরো দিনের শ্রাদ্ধে তর্পণের স্থান ও ক্রম আলাদা হতে পারে। সতেরো দিনের বৃহৎ গয়াশ্রাদ্ধে ৪৫টি বেদির সঙ্গে নয়টি তর্পণস্থলও রয়েছে। নির্বাচিত পূজার ক্রম আগে আমাদের পুরোহিতের কাছে বুঝে নিন।
তর্পণ ও পিণ্ডদান দুটিই শ্রাদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রথমটিতে জল এবং দ্বিতীয়টিতে অন্নের পিণ্ড নিবেদন করা হয়।
কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে না পারলে
পূর্বপুরুষদের নাম, সম্পর্ক ও জানা থাকলে গোত্র লিখে রাখুন। শব্দ, ক্রম ও অন্য নিয়ম পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বদলাতে পারে। বাড়ির তর্পণ শিখতে চাইলে নানা উৎসের নির্দেশ মেশানোর বদলে পুরোহিতের কাছে পরিবারের বিধি বুঝে নিন।
গয়ার পিণ্ডদানের অংশ হিসেবে তর্পণ করাতে চাইলে বায়ু আমাদের পুরোহিতের সঙ্গে পূজা ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা করে। পূজায় অংশ নেওয়ার সময় তিনি ধাপগুলি বুঝিয়ে দেন। কী জানেন আর কী তথ্য নেই জানান; বুকিংয়ের আগে ব্যবস্থা ও খরচ লিখে ঠিক করে প্রস্তুতিতে সাহায্য করব।