
পিতৃকর্ম
ত্রিপিণ্ডী শ্রাদ্ধ
যে পূর্বপুরুষদের নাম আর জানা নেই, তাঁদের উদ্দেশে ধর্মারণ্য বেদিতে যব, চাল ও তিলের তিনটি পিণ্ড অর্পণ করে প্রাচীন কূপে বিসর্জন দেওয়া হয়। আপনাদের জন্য এই বিধি প্রযোজ্য কি না, পাণ্ডাজি বিনামূল্যে পরামর্শ দেবেন।
খরচ—শাস্ত্রবিধি মেনে পূজা, সমস্ত সামগ্রী ও দক্ষিণা
- ত্রিপিণ্ডী শ্রাদ্ধ₹11,000
পরিবারের পরিস্থিতি অনুযায়ী পূজার বিধি আলাদা হয়। কোনটি প্রয়োজন, জানতে ফোন করুন।
কাদের উদ্দেশে করা হয়
ত্রিপিণ্ডী একটি কাম্য শ্রাদ্ধ—বিশেষ উদ্দেশ্যে করা হয়; নির্দিষ্ট তিথির বার্ষিক শ্রাদ্ধ নয়। তিন প্রজন্মের পূর্বপুরুষকে একত্রে উদ্দেশ করে এই কর্ম হয়, বিশেষত যাঁদের নাম আর পরিবারের জানা নেই। তাঁদের জন্য ‘যথানাম-গোত্র’ বলে সংকল্প নেওয়া হয়; নাম ও গোত্র অজানা হলেও নিবেদন পৌঁছয় বলে বিশ্বাস। অন্যভাবে প্রেতবাধা প্রশমিত না হলে, অথবা একজনের পরিবর্তে গোটা বংশের পিতৃকর্ম নিয়ে প্রশ্ন থাকলে এই বিধির কথা বলা হয়।
তিন পিণ্ড—যব, চাল ও তিল
এখানে তিনটি পিণ্ড কেবল তিন দেবতার প্রতীক নয়; প্রয়াত আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন গুণেরও প্রতীক। সত্ত্বরূপে বিষ্ণুর উদ্দেশে যবের পিণ্ড, রজোরূপে ব্রহ্মার উদ্দেশে চালের পিণ্ড এবং তমোরূপে রুদ্রের উদ্দেশে তিল-গুড়ের পিণ্ড অর্পণ করা হয়। নির্দিষ্ট পূর্বপুরুষের নাম জানা নেই বলে তিন রূপেই নিবেদন, যাতে কেউ বাদ না পড়েন। গয়ায় ধর্মারণ্যের প্রাচীন কূপে পিণ্ডগুলি বিসর্জন দিয়ে কর্ম শেষ হয়। এই সমাপনই অন্য বেদির সাধারণ পিণ্ডদান থেকে ত্রিপিণ্ডীকে পৃথক করে।
কোন পরিস্থিতিতে পাণ্ডাজি এই বিধি বলেন
প্রশমিত না হওয়া প্রেতবাধা, তিন প্রজন্মের এমন পূর্বপুরুষ যাঁদের কর্ম হয়নি ও নামও জানা নেই—এসব ক্ষেত্রে এই বিধির কথা বলা হয়। পরম্পরায় তাঁদের সঙ্গে বিবাহে বাধা, সন্তান না হওয়া বা সম্পদ ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যার যোগের কথাও আছে। তবে কোনও সমস্যা দেখেই বিধি স্থির করবেন না। গয়ার পাণ্ডাজিকে প্রকৃত পরিস্থিতি জানান; তিনি বলবেন ত্রিপিণ্ডী প্রযোজ্য, না অন্য কর্ম। এই পরামর্শ বিনামূল্যে এবং এর পরে বুকিংয়ের বাধ্যবাধকতা নেই।
ধর্মারণ্যেই এই কর্ম
ধর্মারণ্য গয়া শহরের দক্ষিণে, বোধগয়ার পথে; পঞ্চবেদী তীর্থের অন্যতম। এখানে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মন্দির রয়েছে। কথিত আছে, পিতার শ্রাদ্ধ করতে ভীমের সঙ্গে গয়ায় এসে তিনি এখানে তপস্যা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর নিহতদের ত্রিপিণ্ডী করাতে কৃষ্ণ পাণ্ডবদের এখানে এনেছিলেন বলেও প্রচলিত। বেদি-পরিক্রমায় ধর্মারণ্য, মতঙ্গবাপী ও বোধগয়ার কর্মের দিন এখানে সাধারণ পিণ্ডদানও হয়। সেটি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত পৃথক কর্ম; ত্রিপিণ্ডী বৃহত্তর বিশেষ অনুষ্ঠান।
অন্য তীর্থের বিধির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না
অন্য তীর্থেও ত্রিপিণ্ডী হয়, তবে সেখানকার পদ্ধতি গয়ার মতো নয়। দুই-তিন দিনের ত্রিপিণ্ডীর কথা পড়ে থাকলে তা অন্য তীর্থের বিধি। গয়ায় ধর্মারণ্যের বেদিতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগে এবং কূপে পিণ্ড বিসর্জনে শেষ হয়। খরচ জানার সময় কোন পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে, জেনে নিন।
বুকিংয়ের আগে কুণ্ডলী বিচার
বাড়িতে অশান্তি বা অসুস্থতা থাকলেই পিতৃদোষ নিশ্চিত হয় না। আগে জন্মকুণ্ডলী পাঠান; বিচার করে কী রয়েছে জানাব। কোনও ইঙ্গিত না থাকলে সেটিও বলব, টাকা দিতে হবে না। ইঙ্গিত থাকলে কোন কর্ম প্রযোজ্য, পাণ্ডাজি স্থির করবেন। নাম অজানা পূর্বপুরুষদের সমগ্র বংশধারা নিয়ে প্রশ্ন হলে ত্রিপিণ্ডী; অন্য পরিস্থিতিতে অন্য বিধি হতে পারে।
গয়ার পুণ্যস্থান
গয়ায় যেখানে পিণ্ডদান হয়
বিষ্ণুপদ মন্দির
গয়ার প্রধান মন্দির। গয়াসুরকে স্থির রাখতে বিষ্ণু পাথরে যে চরণ রেখেছিলেন বলে পুরাণকথা, সেই চরণচিহ্নকে ঘিরেই মন্দির। গয়ার পিণ্ডদানে ভগবানের এই চরণে নিবেদন অন্যতম প্রধান কর্ম।
অক্ষয়বট
সীতাদেবীর আশীর্বাদে চিরজীবী বলে পূজিত বটগাছ। এর নীচে শেষ সুফল গ্রহণ না করলে গয়ার পিণ্ডদান অসম্পূর্ণ বলে মানা হয়। কথিত আছে, রামও এখানে দশরথের উদ্দেশে পিণ্ড অর্পণ করেছিলেন।
ফল্গু নদী
সীতাদেবীর পিতৃকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গয়ার পবিত্র নদী। প্রয়াত পূর্বজনের উদ্দেশে জল ও তিল দিয়ে ফল্গুতে তর্পণের মধ্য দিয়ে কর্ম শুরু হয়।
প্রেতশিলা
বিষ্ণুপদ থেকে 8 কিমি উত্তরের পাথুরে পাহাড়। দুর্ঘটনা বা অন্যভাবে অকালে প্রয়াত আত্মার জন্য এখানে কর্ম হয়। ধর্মশিলায় পিণ্ড ও ছাতু নিবেদনে প্রেতদশা থেকে মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাস।
গয়ার পুরাণকথা
বায়ুপুরাণে গয়ার কথা
বায়ুপুরাণের কথায়, অসুর গয়াসুর এমন কঠোর তপস্যা করেছিলেন যে তাঁর দেহই পবিত্র হয়ে উঠেছিল। যাঁরা তাঁকে স্পর্শ করতেন বা তাঁর দেহের ওপর মৃত্যুবরণ করতেন, সঙ্গে সঙ্গে মোক্ষলাভ করতেন। স্বর্গ পূর্ণ হতে লাগল, নরক শূন্য হল; সৃষ্টির স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বদলে গেল।
শৃঙ্খলা ফেরাতে দেবতারা গয়াসুরের দেহে মহাযজ্ঞ করার অনুমতি চাইলেন। তিনি সম্মত হয়ে আজকের গয়ার ভূমিতে শুয়ে পড়লেন। তবুও দেহ কাঁপতে থাকায় বিষ্ণু একটি পাথরের ফলকের ওপর চরণ রেখে তাঁকে স্থির করলেন। সেই চরণচিহ্ন ঘিরেই আজকের বিষ্ণুপদ মন্দির।
বিনিময়ে গয়াসুর বর চাইলেন—এই ভূমি যেন শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র হয়, যেখানে জীবিতের নিবেদনে প্রয়াতজন মুক্তি পান। বিষ্ণু সেই বর দিলেন। গয়া মাহাত্ম্যে তাই এখানকার পিণ্ডদানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পূর্বপুরুষের মুক্তির কথা বলা হয়েছে।
বায়ুপুরাণেই এই গয়া মাহাত্ম্য বর্ণিত। সেই বায়ুপুরাণ থেকে আমাদের নামের প্রেরণা, আর পিতৃকর্মের এই উদ্দেশ্যেই আমাদের আয়োজন।
কী প্রয়োজন, জানান
প্রতিটি আয়োজনে যা থাকে
যা অন্তর্ভুক্ত
- শাস্ত্রবিধি মেনে পূজা, সমস্ত সামগ্রী ও দক্ষিণা
- তিনটি পিণ্ড—বিষ্ণুর জন্য যব, ব্রহ্মার জন্য চাল, রুদ্রের জন্য তিল ও গুড়
- সমস্ত সামগ্রী—পিণ্ডের উপকরণ, তিল, যব, কুশ ও পঞ্চগব্য
- তিন প্রজন্মের পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ ও সংকল্প
- নাম অজানা হলে ‘যথানাম-গোত্র’ সংকল্প
- ধর্মারণ্য বেদির প্রাচীন কূপে পিণ্ড বিসর্জন
- প্রেতশান্তির নির্ধারিত মন্ত্রপাঠ
- পূজার উপকরণ—ফুল, ধূপ, ঘিয়ের প্রদীপ, বস্ত্র ও পৈতে
- কর্মের অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণভোজন
- সঠিক বিধিক্রমে পাণ্ডাজির নির্দেশনা
যা অন্তর্ভুক্ত নয়
- গয়া পর্যন্ত আসা-যাওয়া
- থাকার খরচ
- কর্মের ব্রাহ্মণভোজনের বাইরে পরিবারের খাবার
- গোদান বা অতিরিক্ত দান (চাইলে ব্যবস্থা হয়)
- আলাদা কর্ম হিসেবে গয়া শ্রাদ্ধ বা পিণ্ডদান
- অতিরিক্ত দক্ষিণা বা দান
গয়ার পাণ্ডাজিরা
যাঁদের তত্ত্বাবধানে আপনাদের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান
পরিচয় ও বংশপরম্পরা যাচাই করা গয়াওয়াল তীর্থপুরোহিতেরা শাস্ত্রবিধি মেনে আপনাদের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করান।
পরিবারের সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্নোত্তর
ত্রিপিণ্ডী ঠিক কাদের জন্য?
তিন প্রজন্মের পূর্বপুরুষকে একত্রে উদ্দেশ করে, তাঁদের নাম ও গোত্র অজানা হলেও এই কর্ম হয়। সেই কারণেই ‘যথানাম-গোত্র’ সংকল্প। প্রশমিত না হওয়া প্রেতবাধার ক্ষেত্রেও এই বিধির কথা বলা হয়।
এটি কি সাধারণ পিণ্ডদানেরই আরেক নাম?
না। বেদি-পরিক্রমায় সাধারণত জানা নামের পূর্বপুরুষের উদ্দেশে পিণ্ডদান হয়। ত্রিপিণ্ডী ধর্মারণ্যের পৃথক কাম্য শ্রাদ্ধ—যব, চাল ও তিলের তিন পিণ্ড কূপে বিসর্জনে শেষ হয়। ধর্মারণ্যেও যে সাধারণ পিণ্ডদান হয়, তা ত্রিপিণ্ডী নয়।
গয়ায় কত সময় লাগে?
বেদিতে প্রায় তিন ঘণ্টা। ধর্মারণ্যে যাওয়া-আসা মিলিয়ে গয়ায় এক দিন রাখুন। দুই-তিন দিনের কথা বলা হলে সেটি অন্য তীর্থের পদ্ধতি হতে পারে।
পূর্বপুরুষের নাম জানি না। তবুও করা যাবে?
হ্যাঁ। এই পরিস্থিতির জন্যই বিধিটি রয়েছে। যতটুকু তথ্য আছে নিয়ে আসুন; নাম অজানা রেখেই সংকল্প হবে। পরিবারের কথা শুনে পাণ্ডাজি বিধি নিশ্চিত করবেন।
এই বিধি সম্পর্কে আরও পড়ুন
সব প্রবন্ধ- ত্রিপিণ্ডী শ্রাদ্ধ, নারায়ণ বলি ও পিতৃদোষ নিবারণ: কোনটির উদ্দেশ্য কী?8 মিনিটে পড়া যাবে
- পিতৃদোষ কী? বিশ্বাস, কুণ্ডলী বিচার ও গয়ার পিতৃকর্ম7 মিনিটে পড়া যাবে
- গয়ায় কোন শ্রাদ্ধ বা পুজো করাবেন? পরিবারের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিধি8 মিনিটে পড়া যাবে
- পিতৃপক্ষের বাইরেও কি গয়ায় পিণ্ডদান করা যায়?7 মিনিটে পড়া যাবে
এখান থেকেই শুরু
কোনও প্রশ্ন থাকলে বলুন, বুঝিয়ে দেব
মা-বাবার উদ্দেশে এই কর্ম আপনাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনও বিধি অসম্পূর্ণ রেখে নয়—প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে, আপনাদের সামনেই শাস্ত্র মেনে কর্ম সম্পন্ন হয়। খরচও শুরুতেই জানানো হয়। আগে কথা বলুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
শ্রাদ্ধে শ্রদ্ধার সঙ্গে বিধিও জরুরি।
শাস্ত্রবিধি মেনে কর্ম সম্পন্ন না হলে শ্রাদ্ধ অসম্পূর্ণ থেকে যায়—আন্তরিক শ্রদ্ধা থাকলেও।










